Law

দলিল কত প্রকার ও কি কি?

দলিল কত প্রকার- দলিল শব্দটির কথা আমরা কম বেশি সকলেই শুনেছি। এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি সম্পদ। যা জমির মালিকানা নির্দেশ করে তাই হচ্ছে দলিল। আসলে দলিল সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা হয়তো সকলেই আছে কিন্তু এটির বিস্তারিত সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই অজানা। দলিল সম্পর্কে সকল প্রকার তথ্য সকলেরই জেনে রাখা উচিত।

দলিল কি?

সাধারনত দলিল বলতে যেকোনো চুক্তির লিখিত আইনকে বোঝায়। তবে বাংলা ভাষায় বিশেষ করে জমি জমা ক্রয় বিক্রয় বন্টন এবং হস্তান্তরের জন্য দলিল শব্দটি বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। দলিলের পাঁচটি মৌলিক তথ্য হলো

*সম্পত্তির বর্ণনা

*দাতার পরিচয়

*গ্রহীতার পরিচয়

*সাক্ষীদের পরিচয়

*দলিল সম্পাদনের তারিখ

দলিল হচ্ছে জমি জমার প্রাণ যিনি জমি কিনছেন দলিলটি তার নিকট বোধগম্য হতে হবে। দলিলে কোন ভুল থেকে গেলে তার দায় বহন করতে হয় জমির ক্রেতাকে। তাই যার হাতের লেখা সুন্দর তাকে দিয়ে বা কম্পিউটারের টাইপ করে দলিল লেখা উচিত।

দলিল কত প্রকার ও কি কি?

বাংলাদেশ ভূমি আইন অনুযায়ী জমির দলিল মোট ৯ প্রকার। যথাঃ

১।সাফ-কাবলা দলিল।

২।দানপত্র দলিল।

৩।হেবা দলিল।

৪।হেবা-বিল এওয়াজ দলিল।

৫। এওয়াজ দলিল।

৬।বন্টননামা দলিল।

৭।অছিওতনামা দলিল।

৮।নাদাবী দলিল।

৯।উইল দলিল।

১। সাফ-কবালা দলিল

কোন ব্যক্তি তার সম্পত্তি অন্যের নিকট বিক্রয় করে যে দলের সম্পাদন রেজিস্ট্রি করে দেন তাকে সাফ কবালা বা বিক্রয় কবালা বা খরিদ কবালা বলে। এই কবালা নির্ধারিত দলিল  স্ট্যাম্পে লেখার পর দলিলদাতা অর্ধেক বিক্রেতা সাব রেজিস্ট্রি অফিসে উপস্থিত হয়ে দলিল সহি সম্পাদন করে গ্রহীতা অর্থাৎ খরিদ্দার এর বরাবরের রেজিস্ট্রি করে দিবেন। দলিল রেজিস্ট্রি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খরিদ্দারের উপর অর্পিত হলো।

২। দানপত্র দলিল

যেকোনো সম্প্রদায়ের যে কোন ব্যক্তি তার সম্পত্তি দান করতে পারেন। এই দানপত্র দলিলের শর্তবিহীন অবস্থায় সকল প্রকার ক্ষমতা প্রদান দান করতে হবে। স্বত্ব সম্বন্ধে দাতার কোন প্রকার দাবি থাকলে দান শুদ্ধ হবে।

৩। হেবা দলিল

মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য এই সেবা দলিলের অর্থ হলো দানপত্র দলিল। এই দলিল কোন কিছুর বিনিময়ে নয় বরং সন্তুষ্ট হয়ে দান করা হয়। এই দলের শর্তবিহীন অবস্থায় দান বা বিক্রয় রেহান রূপান্তর ইত্যাদি সকল ক্ষমতা প্রদানে দান বা হেবা করতে হবে। স্বত্ব সম্বন্ধে দাতার কোন প্রকার দাবি থাকলে সেই দান বা হেবা শুদ্ধ হবে না এবং তা যেকোনো সময় বাতিলযোগ্য।

৪। হেবা-বিল এওয়াজ দলিল

হেবা-বিল এওয়াজ মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি দানপত্র দলিল ও বটে। এই দান ও সন্তুষ্ট হয়ে করা হয়।তবে এটা কোন কিছুর বিনিময়ে দান করা হয়ে থাকে যেমন কোরআন শরীফ জায়নামাজ তসবি মোহরানার টাকা এমনকি যেকোনো জিনিসের বিনিময়ে হতে পারে যেমন আংটি ইত্যাদি।

এই দলিল সম্পূর্ণ শর্তবিহীন অবস্থায় গ্রহীতা হস্তান্তর বা রূপান্তরের সকল ক্ষমতার অধিকারী হবে এবং বিক্রেতার সকল স্বত্ব গ্রহীতার নিকট অর্পিতা হবে। এই দলিল অবশ্যই রেজিস্ট্রি হতে হবে।এই দলিল যদি টাকার বিনিময় হয় এবং ক্রমিক ওয়ারিশী সূত্রে আগে পরে তিন ধাপের পরের ব্যক্তিকে তৃতীয় ব্যক্তিকে হেবা বিল এওয়াজ মূলে দান করে থাকে তাহলে শরীক কর্তৃক জানার তারিখ হতে চার মাসের মধ্যে প্রিয়েমশান করতে হবে।

৫। এওয়াজ দলিল

যেকোনো সম্প্রদায়ের বা একই সম্প্রদায়ের বা একই বংশের বা কোন ব্যক্তি যে কোন ব্যক্তির সহিত তাহাদের সুবিধামতো একের ভূমি অপরকে দিতে পারেন। অর্থাৎ পরস্পর এওয়াজ পরিবর্তন সারতে পারেন। এই দলিল অবশ্যই রেজিস্ট্রি হতে হবে।

এওয়াজ পরিবর্তন দলিলের একটি ব্যাখ্যা দেওয়া হল। যেমন আপনার জমি আমার বাড়ির কাছাকাছি এবং আমার জমি আপনার বাড়ির কাছাকাছি। উভয়ের জমি উভয়ের নিকটস্থ। কাজেই আপনি আপনার জমি আমাকে এবং আমি আমার জমি আপনাকে দিয়ে উভয়ে একটি দলিল সম্পাদন করে রেজিস্ট্রি করে নিলাম। মূলত এটি হচ্ছে এ ওয়াজ দলিল এটি কেহ প্রিয়েমশান করতে পারে না।

৬। বণ্টননামা দলিল

শরীকগণের মধ্য সম্পত্তি ক্রমে নিজ নিজ ছাহাম প্রাপ্ত হয়ে উক্ত ছাহামের বাবদ যে দলিল করতে হয় তাকে বন্টনামা দলিল বলে। একই সম্পত্তিতে মালিক একই বংশের লোককে সাধারণত শরিক বলা হয়। শরিক মূলত দুই প্রকারের উত্তরাধিকার সূত্রের শরিক, ও কোন শরিকের হতে খরিদ সূত্রে শরীক। বন্টন নামা দলিল করার সময় সকল শরিক গণ দলিলে পক্ষ ভুক্ত থেকে ও দস্তখত করে বন্টনামা দলিল করতে হবে। কোন একজন শরিক বাদ থাকলে বন্টন নামা শুদ্ধ হবে না।

এই দলিল রেজিস্ট্রি করতে হবে কিন্তু ঘরোয়া ভাবে বন্টন করে সকল পক্ষগন যদি দলিলের দস্তখত করে থাকেন তাহলেও বন্টননামা কার্যকরী হতে পারে।যদি শরীকগন বন্টন করতে রাজি না হন তাহলে যেকোনো শরীক বন্টনের জন্য আদালতে নালিশ করতে পারেন।

৭। অসিয়তনামা দলিল

কোন ব্যক্তি তার সম্পত্তি উত্তরাধিকারীদের মধ্য অছিয়তকারী ব্যক্তির উত্তরাধিকারীদের মধ্য একজনকে বা কোন তৃতীয় ব্যক্তিকে প্রদান করে থাকেন এবং অছিয়তকারীর মৃত্যুর পর যদি তার উত্তরাধিকারীগন দাবি করে তাহলে যাকে সম্পত্তি অছিয়ত করা হলো সেই ব্যক্তি উক্ত সম্পত্তির এক তৃতীয় অংশ পাবে এবং দুই তৃতীয় অংশ মালিক উত্তরাধিকারীগন সবাই হবে।

৮। নাদাবি দলিল

কোন ব্যক্তির সুনির্দিষ্ট কোন সম্পত্তিতে তার স্বত্বাধিকার নাই মর্মে অথবা স্বত্বাধিকার ত্যাগ করেছেন মর্মে দলিল সম্পাদন ও রেজিস্ট্রি করে দিতে পারেন এরূপ দলিলকেই না-দাবী দলিল বলা হয়।

৯। উইল দলিল

হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক তাদের নিজ সম্পত্তি তাদের আত্মীয়দের মধ্য যাকে ইচ্ছা উইল করে দিতে পারেন। যিনি উইল করেন তিনি একের অধিক উইল করতে পারেন। কিন্তু সর্বশেষ যে উইল করলেন কেবল ওইটাই কার্যকরী হবে।

দলিল কত প্রকার ও দলিল রেজিস্টার করার পূর্বে করণীয়

রেজিস্টার করার আগে দলিটি সম্পাদন করতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দলিল লেখকের দ্বারা লিখুন এবং দলিল রেজিস্টার অফিসে দাখিল করার পূর্বে দলিলটি ভালোভাবে যাচাই করে দেখতে হবে। এছাড়া দলিল দাখিলের সময়সূচী দলিল উপস্থাপনের সময়সীমা জেনে দলিলের রেজিস্ট্রেশন ফি কর ও শুল্ক পরিষদ করে দলিল রেজিস্টার অফিসে দাখিল করা প্রয়োজন হয়।

দলিল করতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

*সংশ্লিষ্ট জমির সি এস /এস এ/ আর এস

খতিয়ানের মূল কপি অথবা সহি মুহুরিও নকল ‌কারো কাছে যদি খতিয়ানের মূল কপি না থাকে বা হারিয়ে কিংবা নষ্ট হয়ে যায় তাহলে ইউনিয়ন তথ্য সেবা কেন্দ্র থেকে আবেদন করে জেলা প্রশাসকের রেকর্ড রুমের খতিয়ান সংগ্রহ করতে পারবেন।

*জমির মাঠ পর্চা

এটি সংশ্লিষ্ট উপজেলার সেটেলমেন্ট অফিসারের কার্যালয় থেকে সংগ্রহ করতে হবে। দাগ অথবা খতিয়ান নম্বর জানা থাকলে মাঠ পর্চা বের করা যাবে।

*জমির দাখিলা

হাল সান পর্যন্ত ভূমি উন্নয়ন কর অর্থাৎ খাজনা পরিষদের রশিদ যাকে দাখিলা বলা হয়। ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে দাখিলা সংগ্রহ করতে হবে।

*ওয়ারিশ সনদ

অংশীদার জমি ক্রয় বিক্রয় করার ক্ষেত্রে ওয়ারিশ সনদ প্রযোজ্য। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ করতে হবে।

দলিল রেজিস্ট্রেশন করার পর করণীয়

রেজিস্ট্রি অফিসে আপনার দলিলটি উপস্থাপন করার পর সেটি গ্রহণ করলে আপনার দলিল টির রেজিস্ট্রি সম্পূর্ণ হবে। দলিল গ্রহণ করলে আপনি একটি দলিল নাম্বার পাবেন। এই দলিল নাম্বার দিয়ে দলিলের নকল বা সার্টিফাইড কপি সংগ্রহ করে কাছে লাগাতে পারবেন‌।

জমি দলিল সংক্রান্ত প্রশ্নোত্তর

নামজারি কাকে বলে?

ক্রয় সূত্রে অথবা উত্তরাধিকার সূত্রে অথবা যে কোন সূত্রের জমির নতুন মালিক হলে নতুন মালিকের নাম সরকারি খতিয়ানভুক্ত করার প্রক্রিয়াকেই নামজারি বলে।

আমিন কি?

ভূমি জরিপের মাধ্যমে নকশা প্রস্তুত ও ভূমি জরিপ কাজে নিযুক্ত কর্মচারীকে আমিন।

ওয়ারিশ কাকে বলে?

ধর্মীয় বিধানের অনুযায়ী কোন ব্যক্তি উইল না করে মৃত্যুবরণ করলে তার স্ত্রী সন্তান বা নিকট আত্মীয়দের মধ্য যারা তার রেখে যাওয়া সম্পত্তির মালিক হয় তাদেরকে ওয়ারিশ বলে।

শেষ কথা

আশা করছি উপরের এই জমির দলিল বের করা সম্পর্কিত পোস্ট থেকে জানতে পেরেছেন, দলিল কত প্রকার ও কি কি। এরপরেও আপনাদের যদি জমির দলিল সম্পর্কিত আরো কোন জিজ্ঞাসা থেকে থাকে তাহলে আপনারা পোষ্টের কমেন্টসে আমাদের জানিয়ে দিবেন। আমরা আমাদের সাধ্যমত আপনাকে রিপ্লাই করার বা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব।

বিশেষ দ্রষ্টব্য –

উপরের ইনফরমেশনগুলো সম্পূর্ণভাবে ইন্টারনেট থেকে কালেক্ট করা। এজন্য কোন ভুল ত্রুটি হয়ে থাকলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।

ধন্যবাদ সবাইকে পরবর্তী পোস্ট পড়ার অনুরোধ রইল।

আরো পড়ুনঃ

জন্ম নিবন্ধন তৈরির প্রক্রিয়া:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *